বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমান ভাতা পাবেন আহত জুলাই যোদ্ধারা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে নতুনভাবে সাজাতে যাচ্ছে সরকার। নতুন কর্মসূচি যুক্ত করা, উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গুরুতর আহতদের জন্য নির্ধারিত মাসিক ভাতা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সমান রাখা হয়েছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ বাড়িয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে যা ছিল এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এ হিসাবে বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা।  

আগামী অর্থবছর থেকে নতুনভাবে চালু হওয়া কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী ভাতা কার্যক্রম। এই কর্মসূচির আওতায় মোট ১৬ হাজার ৫১৩ জন উপকারভোগীকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৪৪টি শহীদ পরিবারকে মাসে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।  

একই হারে অর্থাৎ মাসিক ২০ হাজার টাকা পাবেন ‘এ’ শ্রেণির এক হাজার ৬০৭ জন আহত ব্যক্তি। এছাড়া ‘বি’ শ্রেণির এক হাজার ৬১৪ জন আহত ব্যক্তি মাসে ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির ১২ হাজার ৪৪৮ জন আহত ব্যক্তি মাসে ১০ হাজার টাকা করে পাবেন। এ কর্মসূচির জন্য আগামী অর্থবছরে মোট ২৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। 

বর্তমানে বীর মুক্তিযোদ্ধারা মাসিক ২০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পান। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধারাও একই পরিমাণ ভাতা পাবেন। আগামী অর্থবছরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তবে বীর প্রতীক, বীর বিক্রম, বীর উত্তম ও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারগুলোর বিশেষ সম্মানী ৫ হাজার টাকা করে বাড়িয় ২৫, ৩০, ৩৫ ও ৪০ হাজার টাকা করা হচ্ছে।  

সামাজিক নিরাপত্তায় বড় সম্প্রসারণ 

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে। এ লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে আটটি নতুন কর্মসূচি চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।  

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাবে। এ খাতে ব্যয় হবে ১২ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। 

এছাড়া কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এতে ব্যয় হবে এক হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। 

নতুন কর্মসূচির তালিকায় রয়েছে মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষ ও খাদেমদের সম্মানী ভাতা। আরও আরও কর্মহীন শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি, ভিজিএফ কার্যক্রমের পুনর্বিন্যাস, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। 

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবকদের সম্মানী 

মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী কর্মসূচির আওতায় মোট উপকারভোগী ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬ জন। এর মধ্যে ৮৬ হাজার ৮৩৩ জন ইমাম, পুরোহিত ও বিহার অধ্যক্ষ পাবেন মাসে ৫ হাজার টাকা। ৮৬ হাজার ৮৩৩ জন মুয়াজ্জিন, সেবাইত ও বিহার উপাধ্যক্ষ পাবেন মাসে ৩ হাজার টাকা। ৮২ হাজার খাদেম পাবেন মাসে ২ হাজার টাকা।  

আরও পড়ুন
সুশাসনের অভাবেই ব্যাংক খাত ভঙ্গুর অবস্থায়: ডেপুটি গভর্নর 
ঢাকাসহ কয়েক জেলায় ভূমিকম্প 

এছাড়া ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা দুই ঈদে মোট ২ হাজার টাকা উৎসব ভাতা পাবেন। অন্যদিকে পুরোহিত, সেবাইত ও বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা ও বড়দিন উপলক্ষে ২ হাজার টাকা উৎসব ভাতা পাবেন। 

বাড়ছে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা 

আগামী বাজেটে বিদ্যমান কয়েকটি বড় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হচ্ছে। বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। উপকারভোগী সংখ্যা ৬১ লাখ থেকে বেড়ে হবে ৬২ লাখ। 

বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ভাতাও ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উপকারভোগী এক লাখ বাড়িয়ে ৩০ লাখ করা হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করা হচ্ছে। উপকারভোগীও ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে হবে ৩৮ লাখ করা হবে।   

পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির পরিমাণ ও সংখ্যা উভয়ই বাড়ানো হচ্ছে।প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তিপ্রাপ্ত সংখ্যা ৮১ হাজার থেকে এক লাখে বাড়ানো হচ্ছে। এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৮৭০ কোটি টাকা। 

মা ও শিশুসহায়তা কর্মসূচির ভাতার হার ৮৫০ টাকাই থাকছে। তবে উপকারভোগী সংখ্যা এক লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জন করা হচ্ছে। 

অন্যদিকে ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের এককালীন আর্থিক সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হচ্ছে। 

এনআইডি বাধ্যতামূলক, আসছে ডিএসআর 

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম কমাতে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতে নতুন কিছু শর্তও যুক্ত করা হচ্ছে। 

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উপকারভোগীদের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক হবে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন ও অভিভাবকের এনআইডি থাকতে হবে। 

একই সঙ্গে চালু করা হবে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)। এই ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে অনলাইনে সুবিধাভোগীদের তথ্য সংরক্ষণ, যাচাই ও বিশ্লেষণ করা হবে। ফলে ভুল ব্যক্তি ভাতা পাওয়ার সুযোগ কমবে বলে মনে করছে সরকার। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের হাতে নির্ধারিত সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। নতুন বাজেটে ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগী বাড়ানোর পাশাপাশি সেই লক্ষ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হচ্ছে। 

এমএএস/কেএসআর



from jagonews24.com | rss Feed

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.