হাওরে গোখাদ্য সংকট, ঈদের আগেই অনেকে বিক্রি করছেন গবাদিপশু

খড়ের খালি মাচার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন ইটনার কৃষক মোহাম্মদ আমির। গোয়ালঘরে বাঁধা তিনটি গরু বারবার ডাকছে খাবারের জন্য। কিন্তু সামনে দেওয়ার মতো শুকনো খড় নেই। মাঠে নেই সবুজ ঘাস। বন্যায় হাওরের মাঠে এখন পানি, খলায় ভেজা ধান, খড়ও পচে গেছে, আর বাজারে খড়ের অস্বাভাবিক দাম—সব মিলিয়ে বন্যায় ধান হারানো এই কৃষকের এখন গরু বাঁচানোই বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘ধান হারিয়ে তো সব গেছে। সংসারের শেষ সম্বলটাও যাইবো, আবার খাওয়াইতেও পারতেছি না, এখন খড়ের জন্য গরু বিক্রি কইরা দিতে অইবো’—বলছিলেন মোহাম্মদ আমির।

অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে এবার শুধু বোরো ফসলই নয়, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সংকট তৈরি হয়েছে গোখাদ্যেরও। সময়মতো ধান কাটতে না পারা, খড় ভিজে নষ্ট হওয়া এবং মাঠে পানি জমে থাকায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকটে পড়েছেন হাজারো কৃষক ও খামারি। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর প্রভাব আসন্ন ঈদে কোরবানির পশুর হাটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

খামারিরা বলছেন, গোখাদ্যের সংকট ও বাড়তি খরচের কারণে গরু মোটাতাজাকরণ ব্যাহত হচ্ছে। এর আগেই বিক্রি করতে হচ্ছে গরু। এতে মাংস উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারেও বাড়তে পারে কোরবানির পশুর দাম।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরাঞ্চল মানুষের খাদ্য ধানের জন্য শুধু নয়, গবাদিপশুর প্রধান খাদ্যেরও উৎস। বোরো মৌসুমের খড়ের ওপর সারা বছরের বড় একটি সময় নির্ভর করেন কৃষকরা। ফলে এবার বন্যায় ধান তলিয়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে গোখাদ্যের ওপর।

হাওরের পানিতে তলিয়ে যেমন ধান নষ্ট হয়েছে, টানা বৃষ্টিতে খড়ও পচে গেছে। এতে খড়ের সংকট তৈরি হওয়ায় গরুকে পর্যাপ্ত খাবার দিতে পারছেন না খামারিরা। যা এসব পশুর স্বাস্থ্য ও ওজন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কোরবানির বাজারেও পশুর সরবরাহ কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী ও তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুকানোর জায়গা না থাকায় অনেক কৃষক খড় সংরক্ষণ করতে পারেননি। কোথাও কোথাও সেগুলো পানিতে পচে কালচে হয়ে গেছে। এছাড়া হাওরে পানি আসায় কাঁচা ঘাসও নেই এখন। এতে অল্প পরিমাণ খাদ্য খাইয়ে পশুগুলোতে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখছেন তারা। অনেক কৃষক আবার খড়ের অভাবে গরুগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার বাজারে এসময় ভুষির দামও বেড়েছে বস্তাপ্রতি দুই থেকে তিনশো টাকা।

অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর এলাকার খামারি মামুন মিয়া জাগো নিউজকে জানান, প্রতিবছর বোরো মৌসুমে যে খড় গোয়ালঘরে তোলা হয়, তা দিয়েই প্রায় ছয় মাস গরুর খাবার চলে। কিন্তু এবার বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ খড় নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বাজার থেকে খড় কিনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। চাহিদার তুলনায় খড়ও পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এত দামে খড় কিনে গরু পালন করা কঠিন। কোরবানির জন্য যে গরুগুলা প্রস্তুত করতেছিলাম, ঠিকমতো খাবার দিতে না পারলে ওজনও বাড়বে না। তাই এখনই বিক্রি করতে হচ্ছে।

নিকলীর ছাতিরচরের গ্রামের কৃষাণী সফুরা খাতুন বলেন, ধানই বাঁচাইতে পারি নাই, আবার খড়ও নষ্ট হইছে। গরুরে কী খাওয়ামু এই চিন্তায় ঘুম আসে না। এবার গরু কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

হাওরাঞ্চলের অনেক পরিবারে নারীরাই গবাদিপশুর দেখাশোনা করেন। কিন্তু গোখাদ্যের সংকটে তারাও এখন দিশেহারা।

ইটনার বড়িবাড়ি গ্রামের গৃহিণী রাশিদা বেগম বলেন, দুইটা গাভী আছিল, দুধ বিক্রি কইরা সংসারে সাহায্য করতাম। এখন খাবারের অভাবে দুধও কমে গেছে। বাজার থেইকা খাবার কিনতে গেলে লাভ তো দূরের কথা, উল্টা লোকসান।

স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শুধু খড় নয়, ভুষি ও খৈলের দামও বেড়েছে।

মিঠামইনের গোপদীঘির গ্রামের খামারি আলাল মিয়া বলেন, দুধের দাম বাড়ে নাই, কিন্তু খাবারের দাম বাড়ছে। ভুষি, খৈল, খড় সবকিছুর দাম বেশি। এখন গরু রাখাই দায়। অনেকেই কোরবানির আগেই গরু বিক্রি করার কথা ভাবতেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাওরের বেশিরভাগ খড় পচে যাওয়ায় বাইরের জেলা থেকে খড় আনতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ বাড়ায় বাজারে দামেও এর প্রভাব পড়ছে।

খামারিরা বলছেন, অনেক ছোট খামারি এবার কোরবানির জন্য গরু মোটাতাজা করতে পারেননি। কেউ কেউ আগেভাগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে কোরবানির সময় স্থানীয় বাজারে পশুর সরবরাহ কমে যেতে পারে।

অষ্টগ্রামের গরু ব্যবসায়ী নবী হোসেন জানান, খাবারের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে গরুর দামও বাড়তে পারে। ছোট খামারিরা এবার বেশি চাপের মধ্যে আছে। এখনই আমরা হাওর থেকে গরু কেনা শুরু করেছি।

তবে খামারিদের অভিযোগ, এখনো দৃশ্যমান কোনো সহায়তা পাননি তারা। ইউনিয়ন পর্যায়ে জরুরি গোখাদ্য সহায়তা, খড় সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং স্বল্পমূল্যে পশুখাদ্য সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।

কিছু এলাকায় কয়েকজন খামারি বিকল্প হিসেবে নেপিয়ার ঘাস চাষ ও সাইলেজ তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে তা খুবই সীমিত। অধিকাংশ কৃষকের সেই সুযোগ বা প্রশিক্ষণ নেই।

ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞ ড. এ বি এম জালাল উদ্দিন বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে খড় সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা, বিকল্প গোখাদ্য উৎপাদন এবং দুর্যোগকালীন সহায়তা ছাড়া এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ হতে পারে। খড়ে সংকটে হাওরের বাজারে ভুষি, খইলসহ বিভিন্ন গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাবে।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও ঢলে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৫২ হাজার কৃষক। কৃষকদের আশঙ্কা, এর বড় প্রভাব পড়বে গবাদিপশু খাতেও।

সব মিলিয়ে, হাওরে এখন শুধু ধান হারানোর হাহাকরই নয়, গরু বাঁচানোরও সংগ্রাম শুরু হয়েছে। খালি খড়ের মাচা আর ক্ষুধার্ত গবাদিপশুর দিকে তাকিয়ে কৃষকের চোখে এখন একটাই আতঙ্ক—‘ফসল গেল, এবার গরুগুলারে কেমনে বাঁচামু?’

প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জেলায় এবার চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ৩৯ হাজার বেশি রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, হাওরের অতিবৃষ্টিতে ধান যেমন পচে গেছে, খড় পঁচেও গোখাদ্যের সাময়িক সংকট হচ্ছে। এ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে কোরবানির বাজারে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, গোখাদ্যের অভাবে এখনই হাওরাঞ্চলের মানুষ গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে হয়তো তারা সঠিক দাম পাবে না।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কৃষকদের বিকল্প খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ঘাস চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি।

এসকে রাসেল/এমকেআর



from jagonews24.com | rss Feed

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.