আ’লীগের তিন মন্ত্রীর আমলের পিও মুছিবুল ফের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে!

বিগত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের তিন শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) ছিলেন মো. মুছিবুল হাসান রিপু। সে সময় গড়ে তুলেছিলেন শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট, যা ‘১২ সিন্ডিকেট’ নামে বহুল পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবার মুখে মুখে। সেই মুছিবুলকে ফের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক অফিস আদেশে তাকে এ পদায়ন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের ‘বিশেষ আগ্রহে’ মুছিবুল হাসানকে তার দপ্তরে পিও করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুছিবুল হাসান রিপু ২০০৮ সালে ১৩তম গ্রেডের স্টেনো কাম টাইপিস্ট পদে যোগদান করেন। ২০০৯ সালে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শাখার উপ-সচিবের টাইপিস্ট হিসেবে পদায়ন পান। সেখান থেকে তার উত্থান। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ‘১২ সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত।

২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের পিএসের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মুছিবুল। সেখানে প্রায় ৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ঢাকাসহ সারাদেশে শিক্ষা প্রশাসনে মন্ত্রী ও তার পিএসের নাম ভাঙিয়ে গড়ে তোলেন একটি বলয়।

পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার তদবির, মাসোয়ারা আদায় হয়ে ওঠে তার আয়ের প্রধান উৎস। অবশ্য তার এ অবৈধ আয়ের ভাগ পেয়েছেন মন্ত্রীর দপ্তর থেকে শুরু করে সচিব ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। তদবির-বাণিজ্যে তখন থেকেই পটু মুছিবুল।

২০১৯ সালে ডা. দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর ওই বছরের ৩ মার্চ মুছিবুলকে বদলি করা হয়। তবে প্রভাব খাটিয়ে মাত্র ৭ দিনের মাথায় তিনি আবারও একই পদে ফিরে আসেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ড থেকে শুরু করে গ্রামপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও ঘুষ নিতে শুরু করেন।

দীপু মনিকে সরিয়ে ২০২৪ সালে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু মুছিবুল বহাল থাকেন তার নিজ পদে। ৫ আগস্টের পর তাকে বদলি করা হয়।

শুধু তদবির বাণিজ্যে আটকে থাকেনি মুছিবুলের কর্মকাণ্ড। নিজ এলাকা পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার এগারোগ্রাম সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রভাব খাটিয়ে তার ভাই মইনুল হাসানকে সভাপতির পদে বসান এবং ১০ বছর সেই পদে টিকিয়ে রাখেন তিনি। এ মইনুল হাসান আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের অর্থদাতা।

পিও মুছিবুলের যত সম্পদ
পিও মুছিবুল হাসান রিপুর বিরুদ্ধে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়ে। তাতে তার বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য উঠে আসে। অভিযোগপত্রের তথ্যমতে, মুছিবুল হাসানের ঢাকার মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাসা নম্বর ২১/১১। তার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে সাভার, মোহাম্মদপুর, টঙ্গী ও বসুন্ধরা এলাকায়ও জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

গ্রামের বাড়িতে প্রায় ৫ বিঘা জমি, করফা বাজারে তিনতলা মার্কেট নির্মাণ, পিরোজপুরের পিটিআই স্কুলের সামনে জমি কিনে বহুতল ভবন করেছেন তিনি। নামে-বেনামে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনদের নামে ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ টাকা রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

মুছিবুলের ‘দেখা করার’ প্রস্তাব
পিও মুছিবুলের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ এবং তদবির করে ফের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফেরার বিষয়ে জানতে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘দেখা করার’ এবং ‘চা খাওয়ানোর’ প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।

মুছিবুল হাসান রিপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। মন্ত্রীর পিএসের পিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, তাই পালন করেছি। তদবির করে পদ নিইনি।’ পিও হওয়ার জন্য এবারও কোনো তদবির করেননি বলে দাবি করেন মুছিবুল।

১২ সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে আমরা ১২ জন স্টেনো কাম টাইপিস্ট পদে যোগদান করেছিলাম। তখন থেকে আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো। সেজন্য আমাদের ১২ সিন্ডিকেট হিসেবে দুর্নাম করতো। আসলে এগুলো কিছুই না। সব ষড়যন্ত্র।’

মুছিবুল হাসান বলেন, ‘আমরা মন্ত্রীর পিএসের পিও। মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় না। এতো ক্ষমতাও নেই। তবে সামনে সহকারী সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেতে পারি। আমরা তো আপনাদের (সাংবাদিক) বাইরের কেউ না। আসেন দেখা করিয়েন, একসঙ্গে বসে চা খাবো।’

বিতর্কিত মুছিবুল হাসানকে পিও পদে বিশেষ আগ্রহে পদায়ন করানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তার মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এএএইচ/এমএমকে



from jagonews24.com | rss Feed

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.