চট্টগ্রামে ডিসি-এসি-ওসিসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের পর পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আদালতে জমা হওয়া মামলার আবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ওই শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের একপর্যায়ে বলা হয়, ‘এ শালা একটা শিবির, ওকে মেডিকেলে নেওয়ার আগে এখানেই গুলি করে মেরে ফেলবো।’

এ ঘটনায় নগর পুলিশের এক ডিসি, এসি ও দুই ওসিসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেছেন ভুক্তভোগীর বড় ভাই। আদালত আবেদনটি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।’

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাকিম মো. জাকির হোসেনের আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন নাজমুল হোসেন নামে এক শিক্ষার্থীর বড় ভাই মো. নজরুল ইসলাম। এতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক উপ-কমিশনারসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়েছে। আদালত আবেদনটি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।

ভিকটিম নাজমুল হোসেন সরকারি সিটি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানার চরবংশী এলাকার মোস্তফা বেপারীর ছেলে।

অভিযুক্তরা হলেন- নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান, কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার অতনু চক্রবর্তী, কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি এস এম ওবায়েদুল হক, বাকলিয়া থানার সাবেক ওসি আফতাব উদ্দিন, কোতোয়ালি থানার পেট্রোল ইন্সপেক্টর (ট্রাফিক) মো. মিজানুর রহমান, তার মুন্সি কনস্টেবল শাহজাহান, এসআই মো. মেহেদী হাসান, রুবেল মজুমদার, রণেশ বড়ুয়া, গৌতম, কনস্টেবল কামাল, বাকলিয়া থানার এসআই আবদুস সালাম, মো. মিজান এবং ওসির দেহরক্ষী কনস্টেবল মো. ইলিয়াছসহ অজ্ঞাতনামা ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ সদস্য।

বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট স্বরূপ কান্তি নাথ বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে গ্রেফতার করে কলেজছাত্র নাজমুল হোসেনকে থানায় নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও নির্যাতন করা হয়। এছাড়া তাকে শিবির ট্যাগ দিয়ে মামলার আসামিও করা হয়। এসব অভিযোগে নগর পুলিশের এক ডিসি, এসি ও দুই ওসিসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতনের আইনে মামলার আবেদন করেছেন ভুক্তভোগীর বড় ভাই। আদালত আবেদনটি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।’

তিনি বলেন, আদালত মামলাটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজুর জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ন্যূনতম এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা দ্বারা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। ভিকটিম, বাদী ও তার পরিবারকে নিরাপত্তা কেন দেওয়া হবে না তা ১৪ দিনের মধ্যে জানাতে আসামিদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ১৮ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে নাজমুল হোসেন বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়। পরে পুলিশ ছাত্রদের ওপর অতর্কিতভাবে লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং রাবার বুলেট ছোঁড়ে। এসময় ঘটনাস্থল থেকে সুস্থ অবস্থায় নাজমুলকে আটক করে শারীরিক আঘাত করতে পুলিশ বক্সে নিয়ে যায়।

এরপর পুলিশ সদস্যরা লোহার স্টিক, বক্সে থাকা স্ট্যাম্প দিয়ে ভিকটিমকে বেধড়কভাবে সারা শরীরে শিবির বলে পেটাতে থাকে। পরে নাজমুলকে পুলিশের একটি গাড়িতে করে প্রথমে চান্দগাঁও এবং আধঘণ্টা পর কোতোয়ালি থানায় নেওয়া হয়। গাড়ি থেকে নামানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনজন এসআই ও একজন কনস্টেবল ‘শিবির আনা হয়েছে’ এবং ‘আন্দোলন করো মজা বুঝবে’ বলে উল্লাস করে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুসি মারতে থাকে।

পরে থানার দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে নিয়ে ‘মজা কি এখনই বুঝবে’ বলে উল্লাস করে নাজমুলের দুই হাত ওপরে তুলে দেওয়ালমুখী করে দাঁড় করিয়ে কাঠের স্ট্যাম্প এবং পুলিশের ব্যবহৃত লোহার লাঠি দিয়ে পিঠ, কোমর ও দুই পায়ের উরুতে বেদম মারধর করে। ওইসময় কোতোয়ালি জোনের এসি অতনু চক্রবর্তী এবং থানার সাবেক ওসি ওবায়েদুল হক ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে চেক করতে থাকে। ওসি মোবাইল ফোনে কিছু না পেয়ে নাজমুলকে শিবির করে কি না জিজ্ঞাসা করে।

তিনি না সূচক জবাব দিলে বুকে লাথি মেরে ফ্লোরে ফেলে দুটি কাঠের স্ট্যাম্প দিয়ে নাজমুলের দুই হাতের দুই বাহুর ওপর রেখে ওই স্ট্যাম্পের ওপর দুইজন করে দুই পাশে দাঁড়ায়। এসময় এসি ও ওসি তাকে শিবিরকর্মী বলে স্বীকার করে নিতে জোর করে। একপর্যায়ে ওই কলেজছাত্র জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এরপর তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু মেডিকেলে না নিয়ে তাকে আবারও কোতোয়ালি থানায় নেওয়া হয়। ওইদিন বিকেলে বাকলিয়া থানার টহল পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

নাজমুলের বড় ভাই নজরুল খবর পেয়ে বাকলিয়া থানায় যায়। এসময় ওসির বডিগার্ড কনস্টেবল মো. ইলিয়াছ তাকে বাকলিয়া থানার দ্বিতীয় তলায় দেখে থানায় কেন ঘুরাঘুরি করতেছে জানতে চায়। তখন সে ছোট ভাইয়ের খোঁজে এসেছে বলায় ওই কনস্টেবল উত্তেজিত হয়ে চিৎকার ও চেঁচামেচি করতে থাকে এবং বলে, ‘এ শালা (ভিকটিম) একটা শিবির, আন্দোলনে যোগ দিছে। ওকে মেডিকেলে নেওয়ার আগে এখানেই গুলি করে মেরে ফেলবো।’ সঙ্গে সঙ্গেই সে দৌড়ে থানার হাজতখানায় গিয়ে শটগান ভিকটিমের দিকে তাক করে গুলি করে মেরে ফেলার ভয় দেখায়।

রাত ১১টার দিকে কলেজছাত্র নাজমুলের অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা করানো হয়। পরে ১৯ জুলাই চিকিৎসাধীন নাজমুলকে ৮ নম্বর আসামি করে বাকলিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। যে মামলায় ১৪ দিন কারাগারে থাকার পর আদালত তাকে জামিনে মুক্তি দেয়।

১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারাদেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হয়। এদিন চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু ও বহদ্দারহাট এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায় পুলিশ, ছাত্রলীগ-যুবলীগ। ওই দিন গুলিতে নিহত হয় দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন। আহত হয় প্রায় দেড়শত ছাত্র-জনতা। গ্রেফতার হন অনেকে।

এএজেড/এমএএইচ/এমআরএম



from jagonews24.com | rss Feed

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.