নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় ১৮২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টি বিদ্যালয়ে পূর্ণ মর্যাদার প্রধান শিক্ষক নেই। উপজেলা শিক্ষা অফিসে ১৩ টি পদের মধ্যে ৭ টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে। মাত্র ১ জন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ৩ জন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও ২ জন অফিস সহায়ক জোড়াতালি দিয়ে কোনভাবে অফিস চালাচ্ছেন। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে ১ টি
পৌরসভা ও
১৩ টি
ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কেন্দুয়া উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১৮২ টি। এসব বিদ্যালয় দেখভালের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে অনুমোদিত রয়েছে ১৩ টি
পদ। এর
মধ্যে মাত্র ৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে অফিসের কাজ চালানো হচ্ছে। তাদের একজনকে কয়েকজনের
দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাকি ৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ৭ জন সহকারি শিক্ষা অফিসারেরর
মধ্যে রয়েছে মাত্র ৩ জন। ৩ জন অফিস সহকারির মধ্যে ২টিই শূন্য পদ। এছাড়া ১টি অফিস সহায়কের
পদ শূন্য রয়েছে।
![]() |
| জনবল সংকটে ব্যহত হচ্ছে কেন্দুয়ার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম |
সমগ্র উপজেলা ৭ টি ক্লাস্টারে বিভক্ত। এর জন্য ৭টি সহকারি শিক্ষা অফিসারের পদ সৃষ্টি করা হলেও এখনো
৪টি পদ শূন্য রয়েছে। তাই
৩ জন সহকারি শিক্ষা অফিসারের মধ্যে প্রত্যেকের ৬০টি করে বিদ্যালয় মনিটরিং করতে হয়। এমনি করে জনবল সঙ্কটে খুঁড়িয়ে
খুঁড়িয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
উপজেলা সহকারি শিক্ষা অফিসার জনাবা তাসলিমা বেগম লিপি জানান, ৭ জন সহকারি
শিক্ষা অফিসার ৭ টি ক্লাস্টারের
দায়িত্বে থাকলেও জনবল সংকটে ৩
জন সহকারি শিক্ষা অফিসারকে ৭ টি
ক্লাস্টার মনিটরিং করতে বেশ বেগ পোহাতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে পদ শূন্য থাকায় একদিকে যেমন নিয়মিত স্কুল মনিটরিং করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অন্যদিকে প্রশাসনিক কাজ করতে এসে গ্রামের শিক্ষকরা হচ্ছেন চরম হয়রানির শিকার, অপেক্ষা করতে হয়
ঘন্টার পর
ঘন্টা, ব্যহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম।
উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৯০টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তাছাড়া অফিসেও
৭টি পদ
খালি আছে।
এভাবে চললে শিক্ষার গুণগতমান ক্ষুন্ন হবে। দ্রুত এ শূন্যস্থানে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ করলে এই
সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মনিরুল ইসলাম বলেন, “জেলা সদর ছাড়া বাকি সব উপজেলাতেই একই অবস্থা। পদগুলো পুরণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী শূন্য পদগুলো পূরণ হলে কর্মকর্তাদের উপর চাপ কমবে।“
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, উপজেলার ১৮২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টি বিদ্যালয়ে পূর্ণ মর্যাদার প্রধান শিক্ষক নেই।
এর মধ্যে
৪৭টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাজ চালানো হচ্ছে। ৪৩টি বিদ্যালয়ে
সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এবং আরও ৯২ টি
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরাসরি পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। তাছাড়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে।
বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও চলতি দায়িত্বে থেকে একই সঙ্গে দুই দায়িত্ব পালন করছেন। এতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদেরও। সেইসঙ্গে ব্যহত হচ্ছে পাঠদানও।
বানিয়াগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) ফোরখান আহমেদ জানান, তাদের বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য রয়েছে। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বিদ্যালয় এবং অফিসের কাজ দুটোই করতে হচ্ছে ফলে বেশি চাপে থাকতে হচ্ছে। তাই দ্রুত একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক সংকটের কারণে
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে হলে শিগগিরই এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ করা দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দুয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও জহুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মো. জামিরুল হক বঅলেন, “উপজেলার ৯০টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্যসহ শিক্ষা অফিসের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারসহ ৭টি পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ে পাঠদানসহ অফিসের কার্যক্রম চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে। শীঘ্রই এসব পদ পুরণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত।“
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জনাব মনিরুল ইসলাম জানান, “প্রধান শিক্ষকের
শূন্য পদগুলোর ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির
মাধ্যমে পূরণ করা হবে। এটির একটি প্রক্রিয়া চলছে।
নিদিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, তবে শূন্য পদগুলো তাড়াতাড়ি পূরণ হবে বলে আশা করছি।“
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত ২০২০ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে
কেন্দুয়া উপজেলায় ১২১ জন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। ২৯
জন সহকারি শিক্ষক এবং ৯২
জন ২০১৩ সালে জাতীয়করণকৃত ৯২
টি স্কুলে পিইডিপি-৪ এর
আওতায় প্রতিটি স্কুলে একজন করে রাজস্বখাতে প্রাক-প্রাথমিক সৃষ্ট পদে। সুপারিশপ্রাপ্ত ১২১ জন শিক্ষকের মধ্যে ১১৯ জন সহকারি শিক্ষক ২২ জানুয়ারি ২০২৩, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের মাধ্যমে নির্ধারিত স্ব স্ব বিদ্যালয়ে যোগদান করেন, বাকি ২জন যোগদান করেনি।
২২ জানুয়ারি ২০২৪ নব যোগদানকৃত শিক্ষকদের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে এক সহকারি শিক্ষক বলেন, গত এক বছরে নব যোগদানকৃত সহকারি শিক্ষকদের মধ্য থেকে প্রায় ৭ জন শিক্ষক প্রাথমিক শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য সরকারি চাকুরীতে চলে যান। নিম্ন গ্রেড,পদোন্নতিতে ধীরগতি,অন্য সরকারি চাকুরীর তুলনায় সুযোগ সুবিধা কম থাকায় আগামীতে এই সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।
“এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, বিষয়টি আমি অবগত আছি, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান আছে। এর মাধমে এই শূন্য পদগুলো পূরন করা হবে।“
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর-২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নিয়োগ পরীক্ষা আগামী ২ ফেব্রুয়ারি
২০২৪ অনুষ্টিত হবে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ময়মনসিংহ
বিভাগে সহকারি শিক্ষক শূন্য পদ ৫৯৯ টি। সে অনুযায়ী কেন্দুয়া উপজেলা গড়ে ১৩ জন সহকারি শিক্ষক পেতে পারে।
এদিকে নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, নেত্রকোনা জেলায় সহকারি শিক্ষকের
শূন্য পদ ২৩০ টি। এ তথ্য অনুসারে প্রতি
উপজেলায় গড়ে ২৩ টি শূন্য
পদ।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার মনিরুল ইসলাম বলেন,চূড়ান্ত নিয়োগের পূর্বে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে আবারও শূন্য পদের চাহিদা পাঠানো হবে। ফলে শূন্য পদের সংখ্যা বাড়তে পারে। এতে সহকারি শিক্ষক সংকট দূর হবে বলে মনে করি।